বিশেষ প্রতিনিধি:

রাজধানীর উন্মুক্ত বিনোদন কেন্দ্র ও ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে নতুন করে বিস্তার লাভ করেছে এক ভয়ংকর মাদক চক্র। পূর্বে বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে একাধিক কারবারির নাম উঠে আসলেও, বর্তমানে উদ্যানের মাদক নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে নতুন এক চক্র। এই রাজত্বের নেপথ্যে রয়েছেন গর্ভবতী নারী মাদক কারবারি আনিকা এবং তাঁর স্বামী নাহিদ।

প্রতিবেদকের সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে প্রতিদিন প্রায় ২০ কেজিরও বেশি গাঁজা সরবরাহ করছেন এই আনিকা। নিজের সাত মাসের শারীরিক অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাকে তিনি কৌশলগত নিরাপত্তা ও আইনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্ভাব্য গ্রেপ্তার বা কড়া পদক্ষেপ এড়াতে নিজের এই শারীরিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিগত পাঁচ মাস ধরে অধরাই থেকে গেছেন তিনি।

উদ্যানের ভেতরে অবস্থিত ফুল ক্যান্টিন এলাকা, রমনা কালী মন্দির এবং মন্দিরের পেছনের পুকুরপাড় এলাকা আনিকা বাহিনীর প্রধান ড্রপ পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে প্রতিদিন ১২ গ্রাম, ২৫ গ্রাম, ১০০ গ্রাম থেকে শুরু করে ৫০ ও ১০০ টাকার খুচরা পোটলায় গাঁজা কেনাবেচা চলে। আনিকার প্রধান শক্তি হলো উদ্যানের অধিকাংশ নারী খুচরা বিক্রেতা তাঁর নিকট থেকেই মাদক সংগ্রহ করেন। আনিকা প্রতিদিন ভোরে উদ্যানে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট ভাগ অনুযায়ী খুচরা বিক্রেতাদের কাছে এই মাদক পৌঁছে দেন এবং প্রতিটি বিক্রয়ের বিপরীতে আকর্ষণীয় কমিশন প্রদান করেন। এমনকি কোনো খুচরা বিক্রেতা গ্রেপ্তার হলে তাঁদের দ্রুত জামিনে মুক্ত করার যাবতীয় দায়িত্ব ও খরচ বহন করেন তিনি নিজে। অথচ এই পুরো সিন্ডিকেটের নেপথ্য কারিগর তাঁর স্বামী নাহিদ থাকেন সর্বদাই ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে আনিকার অধীনে সক্রিয় এক সুবিশাল নারী বাহিনীর উপস্থিতি। এর মধ্যে অন্যতম বৃষ্টি, নাসরিন, সেলিনা, কুলসুম, তানিয়া ও পুতুলের মতো একাধিক খুচরা কারবারি। এছাড়া কিছুদিন আগে আরেক চিহ্নিত কারবারি তানজিলা গ্রেপ্তার হলেও তাঁর স্বামী হৃদয় বর্তমানে উদ্যানের বিভিন্ন গোপন জায়গায় গাঁজা ও ইয়াবার কেনাবেচা সচল রেখেছেন।

সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, টিএসসি সংলগ্ন গেটটি বন্ধ থাকায় পুলিশি অভিযানের সংকেত পেলেই আনিকা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত দেয়াল টপকে উদ্যান সীমানার বাইরে ছিটকে পড়েন। তবে অভিযানের পূর্বেই মাদক কারবারিরা কীভাবে সতর্ক বার্তা পেয়ে নিরাপদে কেটে পড়েন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, সংবাদসংগ্রহে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীরা প্রামাণ্য চিত্র ধারণ করতে গেলে তাঁদের প্রকাশ্যে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করতেও দ্বিধা করে না এই চক্রটি।

কেবল আনিকা-নাহিদ দম্পতিই নন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নির্দিষ্ট এলাকা ভাগ করে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে আরও কয়েকটি চক্র। এর মধ্যে অন্যতম হিজড়া সুমন, ডিস কালু, ইব্রাহিম ও নাছুর সিন্ডিকেট। এদের প্রত্যেকের অধীনে ২ থেকে ৪ জন করে সক্রিয় খুচরা বিক্রেতা দিন-রাত মাদকের এই অবৈধ বাণিজ্য বজায় রাখছে।

উদ্যানের এমন আশঙ্কাজনক ও কদর্য পরিবেশে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে এখানে এসে কিছুটা সময় স্বস্তিতে কাটানোর কোনো পরিবেশ অবশিষ্ট নেই। চারপাশ থেকে মাদকের উৎকট গন্ধ আসে। সবচেয়ে বিষাদময় বিষয় হলো, কারা এসব ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি তা সবার জানা থাকা সত্ত্বেও অদৃশ্য কারণে একই চক্র মাসের পর মাস পার পেয়ে যাচ্ছে।”

সাভার এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে উদ্যানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী কামরুল হাসান বলেন, “ঐতিহাসিক এই উদ্যানটি এখন মাদকসেবী আর কারবারিদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ছোট ছোট সন্তানদের সামনে যেভাবে প্রকাশ্যে এসব কেনাবেচা চলে, তাতে কোনো সুস্থ পরিবেশ বিদ্যমান নেই। এদের পেছনে কী অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে, তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”

উদ্যানের সার্বিক আইনি পরিস্থিতি ও শৃঙ্খলা রক্ষা প্রসঙ্গে শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জানান, “সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষা ও মাদক নির্মূলে শাহবাগ থানা পুলিশ অত্যন্ত তৎপর রয়েছে। অপরাধীরা গ্রেপ্তার এড়াতে নিত্যনতুন কৌশল ও ছদ্মবেশ ধারণ করে থাকে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা কাটিয়ে উঠতে কৌশলগত অভিযান জোরদার করেছে। কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধী বা সিন্ডিকেটকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই আসে না; উদ্যানকে পূর্ণাঙ্গরূপে অপরাধমুক্ত করতে শীঘ্রই যৌথ সমন্বয়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ দৃশ্যমান হবে।”

অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সমন্বিত উদ্যোগ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অধিদপ্তরটির মহাপরিচালক হাসান মারুফ জানান, “সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো উন্মুক্ত স্থানে মাদক সিন্ডিকেটের তৎপরতা রোধে আমাদের বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কৌশলগত সুবিধা নিয়ে যারা রেহাই পাওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। অচিরেই ডিএনসির বিশেষ টিমের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট হটস্পটগুলোতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”

অনতিবিলম্বে এই চিহ্নিত নারী সিন্ডিকেট ও তাদের পেছনের মদদদাতাদের চিহ্নিত করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের আইকনে ক্লিক করুন।
We use all content from others website just for demo purpose. We suggest to remove all content after building your demo website. And Dont copy our content without our permission.